. .
কুতুবদিয়া প্রতিনিধি
পাড়ার মাঠে অন্যদের ফুটবল খেলতে দেখে তারাও স্বপ্ন দেখত খেলোয়াড় হওয়ার। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় একটি ফুটবল কেনার সামর্থ্য ছিল না। শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে ভুল পথে পা বাড়ায় কুতুবদিয়ার তিন কিশোর। ফুটবল কেনার টাকা জোগাড় করতে তারা পাশের বাড়ির হাঁস চুরি করে। পরে হাঁসটি বিক্রি করতে নিয়ে আসে ধূরুং বাজারে।
তবে বিক্রির আগেই বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নজরে আসে উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব আবুল কাশেমের। তিনি বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমানকে জানান।
তিন কিশোর হলো উত্তর ধূরুং ইউনিয়নের তেলিয়াকাটা এলাকার মৎস্য শ্রমিক মামুনের ছেলে মনির উদ্দিন শাহনেক (১৩), মৎস্য শ্রমিক মিজানের ছেলে মিনহাজ (১২) এবং দিনমজুর খোরশেদ আলমের ছেলে মুজাহিদ (১১)।
সাধারণত এমন ঘটনায় শিশু-কিশোরদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। তবে তিন কিশোরের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখেন ইউএনও মো. মিজানুর রহমান। তিনি জানতে পারেন, হাঁস চুরির পেছনে তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ফুটবল কেনার টাকা জোগাড় করা। অভাবের সংসারে তাঁদের অভিভাবকদের সন্তানদের খেলাধুলার সামগ্রী কিনে দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই।
ইউএনও তিন কিশোরকে তাদের ভুলের বিষয়ে বোঝান ও সতর্ক করেন। তিনি বলেন, অন্যের জিনিস নেওয়া কোনোভাবেই ঠিক নয়। স্বপ্ন পূরণ করতে হলে সঠিক পথেই এগোতে হবে।
এরপরই আসে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। যে ফুটবল কেনার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তিন কিশোর হাঁস চুরি করেছিল, বুধবার বিকেলে সেই ফুটবলই তাদের হাতে তুলে দেন ইউএনও।
অফিসার্স ক্লাবে আয়োজিত এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অসীম কুমার দাস, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইকবাল হাসান, উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মুসলিম উদ্দিন, উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব আবুল কাশেম, ক্রীড়া সংগঠক এহাছান মোহাম্মদ ছেটন ও মোহাম্মদ মুবিন।
নতুন ফুটবল হাতে পেয়ে তিন কিশোরের মুখে ফুটে ওঠে আনন্দের হাসি। ভুল কাজের অপরাধবোধের জায়গায় তখন তাদের চোখে ছিল মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলার স্বপ্ন। এখন নিয়মিত মাঠে খেলাধুলা করার প্রত্যয় তাদের।
উত্তর ধূরুং ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ইমরুল ফারুক বলেন, ১২–১৩ বছরের কিশোরদের ভুলকে শুধু অপরাধ হিসেবে দেখলে হবে না। তাদের পারিবারিক বাস্তবতা, স্বপ্ন ও বেড়ে ওঠার পরিবেশও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। শাসনের পাশাপাশি তাদের ভালোবাসা, শিক্ষা ও সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া জরুরি। তিনি ইউএনওকে এ উদ্যোগের জন্য ধন্যবাদ জানান।
উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব আবুল কাশেম বলেন, শাহনেক, মিনহাজ ও মুজাহিদের ঘটনা শুধু হাঁস চুরি কিংবা একটি ফুটবল পাওয়ার গল্প নয়। এটি অভাবের মধ্যেও স্বপ্ন দেখা তিন কিশোরের গল্প। ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে তাঁদের সেই স্বপ্নকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন ইউএনও।
তিন কিশোরের এই গল্পে শাস্তির চেয়ে সংশোধনের সুযোগই বড় হয়ে উঠেছে। একটি ফুটবল হয়তো শুধু খেলনার সামগ্রী নয়; তাদের কাছে এটি সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার নতুন প্রেরণা।
মন্তব্য করুন