চকরিয়া প্রতিনিধি
চকরিয়ায় শেভরণ বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের পর জান্নাতুল মাওয়া লুচি (২২) নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের বিক্ষোভ মুখে ও সোস্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি ভাইরাল হলে তাঁর পরের দিন হাসপাতালটিতে অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
শনিবার (২৯ আগষ্ট) দুপুর ১২টার দিকে চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শফিউল আলমের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন।
নিহত জান্নাতুল মাওয়া লুচি চকরিয়া পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের হালকাকারা এলাকার বাসিন্দা শেফায়েত মাসুমের স্ত্রী।
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, দালালের মাধ্যমে লুচিকে সেভরণ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত তিনি স্বাভাবিক ছিলেন। পরে তাকে রক্ত দেওয়ার সময় হঠাৎ শরীরে খিঁচুনি শুরু হয়। অবস্থার অবনতি হলে সন্ধ্যার দিকে তার মৃত্যু হয়। তারা বলেন, মৃত্যুর পর রোগীকে দেওয়া রক্তের ব্যবহৃত ব্লাড ব্যাগ দেখতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে তাদের মধ্যে সন্দেহ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয় লুচির সিজারিয়ান অপারেশনের সঙ্গে ডা. নিশাত ফারজানা সৌরভী সম্পৃক্ত ছিলেন। অপারেশনে সহযোগী হিসেবে হিরা বর্মন, নাজেম ও সাথী নামে নার্স ছিলেন বলেও তারা অভিযোগ করেন।
নিহতের স্বজনরা আরও বলেন, পর্যাপ্ত গাইনি বিশেষজ্ঞ ও এনেস্থেশিয়া চিকিৎসকের ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও প্রসূতির সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়েছে। চিকিৎসায় অবহেলা ও হাসপাতাল পরিচালনায় গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলে তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
প্রসূতির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে হাসপাতাল এলাকায় উত্তেজনা ও বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্বজনদের অভিযোগ, প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনার পরে হাসপাতালের অফিস বন্ধ করে কর্তৃপক্ষের লোকজন সরে যান। শেভরণ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল কবিরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
নিহতের স্বজনদের আরও অভিযোগ, যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই ‘শেভরণ ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নাম ব্যবহার করে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেভরণ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একজন পরিচালক বলেন, হাসপাতালটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে আলাদা এবং কয়েকজন মিলে এটি পরিচালনা করছেন।
জানা গেছে, উল্লেখিত শেভরণ হাসপাতালে এরই আগেও ২০২৫ সালের ২৬ মে শেভরণ হাসপাতাল পরিদর্শন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা মেনে চলার জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে একই বছরের ৩ জুলাই ভ্রাম্যমাণ আদালতে অভিযান পরিচালনা করলে হাসপাতালটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন বলেন, রোগী মৃত্যুর বিষয়ে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিপূর্বেও শেভরণ ক্লিনিকে অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু তারা কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করছে না। সরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে যারা সবসময় অপপ্রচারে লিপ্ত থাকে, এই মৃত্যুর দায় সে সব দালালদের। হাসপাতাল সড়কে দালাল ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে আমি প্রতিনিয়ত দালালদের রোষানলে পড়ছি। মূলত দালালদের কারণে সঠিক প্রসূতিসেবার অভাবে এ ধরণের মৃত্যুর বিষয়টি ঘটেছে বলে জানিয়েছেন।
অভিযানে নেতৃত্বে দেয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শফিউল আলম জানান, শেভরণ নামে একটি বেসরকারি হাসপাতালের অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসময় হাসপাতালের লাইসেন্স, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স না থাকায় এবং ডিএমএফ (ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি) দিয়ে হাসপাতাল পরিচালনার অভিযোগসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে সংশ্লিষ্ট আইনে ৭০হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।